হরপ্পা সভ্যতার বৈশিষ্ট্য

হরপ্পা সভ্যতার বৈশিষ্ট্য

হরপ্পা সংস্কৃতির আবিষ্কার ভারতীয় সভ্যতার প্রাচীনত্বের ধারণাটিকেই বদলে দিয়েছে । ধারাবাহিকতার কারণে আর্য সভ্যতাকেই ভারতের প্রাচীনতম সভ্যতা বলে পূর্বে মনে করা হত । কিন্তু বিংশ শতকের দুয়ের দশকে হরপ্পা সংস্কৃতির আবিষ্কার থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে , খ্রীষ্টপূর্ব তিন সহস্রাব্দের আগের ভারতে এক অতি উন্নত নগর সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল । হরপ্পীয়দের জীবনধারা , শিল্প চেতনা , অর্থনীতি ইত্যাদির উন্নত রূপ সত্যই বিস্ময়কর ছিল।

নগর সভ্যতা

হরপ্পা সভ্যতার বিশেষ উল্লেখযোগ্য একটি বৈশিষ্ট্য হল এর পরিকল্পিত নগরী । মহেঞ্জোদারো এবং হরপ্পা – দুটি নগরেই পরিকল্পনার ছাপ স্পষ্ট । মার্টিমার হুইলার মনে করেন , এই দুটি নগর যখন নির্মিত হয়েছিল , তখন নগর – পরিকল্পনা বিদ্যা সংগঠকদের যথেষ্ট করায়ত্ত ছিল । শহরের অধিকাংশ গৃহই ছিল পোড়া ইট দ্বারা বেষ্টিত । কুটীর থেকে দ্বিতলবিশিষ্ট ইমারত — সব ধরনের বাড়িই নির্মিত হয়েছিল । ঘরগুলির দেওয়াল ছিল খুবই মসৃণ । আবাসিক বাড়িগুলি প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত ছিল । খুব বড় বা ছোট নয় এমন মাঝারি বাড়ির সংখ্যাও ছিল যথেষ্ট ।  

তাই অধ্যাপক ব্যাসাম মনে করেন , সমসাময়িক মিশর বা সুমেরীয় সভ্যতার তুলনায় সিন্ধু উপত্যকায় মধ্যবিত্তের সংখ্যাও ছিল বেশি । প্রতিটি বাড়িতেই স্নানাগার ও পয়ঃপ্রণালীর ব্যবস্থা ছিল । বাড়ির জঞ্জাল ফেলার জন্য রাজপথের ধারে বড় বড় আবর্জনা-কুন্ড থাকত । নগরের মাঝবরাবর ছিল সুপ্রশস্ত রাজপথ । বাড়ির সাথে যোগাযোগের জন্য ছিল গলিপথ । এক গলিপথ থেকে অন্য গলিপথে যাওয়ার ব্যবস্থাও ছিল । রাজপথের পাশ দিয়ে ছিল টানা ‘ আচ্ছাদিত নর্দমা ‘ । বাড়িগুলি থেকে পোড়ামাটির নলের মধ্য দিয়ে জলসমুহ বড় নর্দমায় এসে পড়ত । এত প্রাচীনকালে মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার নাগরিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সচেতনতা দেখে পণ্ডিতদের অনুমান ঐ সময় পৌর শাসনব্যবস্থা বর্তমান ছিল ।

স্নানাগার , দুর্গ ও শস্যাগার

হরপ্পা সংস্কৃতির আর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল বৃহৎ স্নানাগার , দুর্গ ও বড় বড় শস্যভাণ্ডার নির্মাণ । মহেঞ্জোদারোতে ৩৯ ফুট লম্বা , ২৩ ফুট চওড়া ও ৮ ফুট গভীরতা বিশিষ্ট একটি সুবৃহৎ স্নানাগার আবিষ্কৃত হয়েছে । এতে জল ঢোকাবার ও বের করবার ব্যবস্থা ছিল । স্নানাগারের তিনপাশে ছিল বারান্দা এবং তার পাশে ছিল ছোট ছোট ঘর । হুইলারের মতে , স্নানাগারটি ধর্মীয় কারণে ব্যবহৃত হত এবং ঘরগুলি ছিল পুরোহিতদের আবাসস্থল । 

কিন্তু ডি. ডি. কোশাম্বীর মতে , অভিজাতদের জলকেলির জন্য এটি ব্যবহৃত হত এবং ঘরগুলি অনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হত । মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার নিরাপত্তার জন্য যে বড় বড় দুর্গ নির্মিত হয়েছিল , তার প্রমাণও পাওয়া গেছে । হরপ্পার দুর্গটির দেওয়াল ছিল ১৩ মিটার চওড়া । দেওয়ালের কোণগুলিতে ছিল গম্বুজ । এটিকে অনেকে পুরোহিত নাসকের রাজপ্রাসাদ বলে মনে করেন । নগর  দুটিতে যে শস্যভান্ডারের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে , তা থেকে অনুমিত হয় ঐ সময়ে আপংকালীন সময়ের জন্য শস্য মজুত রাখার ব্যবস্থা ছিল ।

শাসনব্যবস্থা 

হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোতে কি ধরনের শাসনব্যবস্থা প্রচলিত ছিল , তা সঠিক জানা যায়নি । তবে শহরের বিন্যাস দেখে অনুমিত হয় পৌরব্যবস্থা প্রচলিত ছিল । একই ধরনের রাস্তাঘাট , অট্টালিকা , ওজন ও মাপ দেখে বোঝা যায় , ঐ অঞ্চলে একটি কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা প্রচলিত ছিল ।

জীবিকা

সিন্ধুবাসীদের প্রধান জীবিকা ছিল কৃষি । কৃষিজাত দ্রব্যের মধ্যে গম , যব , ধান ও বার্লি ছিল প্রধান । সম্ভবত নদীর জল বাঁধ দিয়ে ধরে রেখে চাষের কাজে লাগানো হত । কৃষকদের কাছ থেকে উৎপন্ন ফসল কর হিসেবে নেওয়া হত । এদের প্রধান খাদ্য ছিল গম , যব ভাল , বাদাম , খেজুর প্রভৃতি । আমিষ খাদ্যের মধ্যে ভেড়া ও শূকরের মাংস এবং নদীর মাছ ছিল প্রধান । পশুপালন সিন্ধু অধিবাসীদের অজানা ছিল না । গৃহপালিত পশুর মধ্যে গাজ , মহিষ , ভেড়া , ছাগল , শুকর ছিল উল্লেখযোগ্য । তখন ঘোড়ার প্রচলন ছিল কিনা জানা যায়নি।

শিল্প

সিন্ধু অঞ্চলে ধাতু শিল্প ও মৃৎ শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটেছিল । এ সময়ে লোহার কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি । ধাতুর মধ্যে তামা ও ব্রোঞ্জের ব্যবহার ছিল । বাড়ি থেকে বর্শা , কুঠার , বঁড়শি , করাত , সূচ প্রভৃতি তৈরি করা হত । রূপার ব্যবহার ছিল ব্যাপক । মৃৎশিল্পীরা পলিমাটি , বালি ও চুনের গুঁড়ো মিশিয়ে কলসী , জলা , থালা , নানারকমের খেলনা তৈরি করত । এগুলিকে আগুনে পুড়িয়ে মজবুত করে রং লাগানো হত । কাচের মত চকচকে ও মসৃণ চীনামাটির পাত্র নির্মাণে এরা ছিল খুবই দক্ষ । তবে হরপ্পা-সংস্কৃতির লোকেরা শিল্পরুচিসম্মত ছিল বলে মনে হয় না । ‘ Art of Arts Sake’— এই নীতিতে তারা আদৌ বিশ্বাসী ছিল না । তাদের শিল্পকর্ম বা নগর পরিকল্পনা সবই ছিল প্রয়োজনভিত্তিক । কঠোর আত্মসংযম ছিল তাদের স্থাপত্যকর্মের মূল বৈশিষ্ট্য ।

বাণিজ্য

সিন্ধুবাসীরা ব্যবসাবাণিজ্যে যথেষ্ট দক্ষ ছিল । দেশে ও বহির্দেশে এই ব্যবসা চলত । চাকা বিশিষ্ট গাড়ি ও নৌকার সাহায্যে ব্যবসাবাণিজ্য চলত । ভারতের বাইরে মধ্য- এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার সাথে হরপ্পার ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল । মিশর , ক্রীট এবং বিশেষভাবে মেসোপটেমিয়া এবং সুমেরু -এর সাথে ব্যাপক বাণিজ্যিক লেনদেন চলত । কেবল স্থলপথে নয় , জলপথেও বাণিজ্য চলত ।  

সম্প্রতি লোথাল -এ খননকার্যের ফলে প্রাপ্ত তথ্যাদি ব্যাপক সামুদ্রিক বাণিজ্যের ইঙ্গিত বহন করে । রপ্তানি দ্রব্যের মধ্যে প্রধান ছিল বিভিন্ন বিলাস দ্রব্য , যেমন — ময়ুর , হাতির দাঁত ও তা থেকে তৈরি নানা দ্রব্যাদি , মণিমুক্ত ও সূতীবস্ত্র ইত্যাদি । আমদানিতে প্রধান রূপা ও নীলকান্তমণি । মেসোপটেমিয়ায় বহু ভারতীয় বণিক স্থায়িভাবে বসবাস করত । শিল্পের প্রয়োজনে কাঁচামাল দেশ  বিদেশ থেকে আমদানি করা হত । যেমন হিমালয় থেকে দেবদারু কাঠ , বেলুচিস্তান ও রাজস্থান থেকে তামা , পারস্য থেকে রূপা , সৌরাষ্ট্র ও দাক্ষিণাত্য থেকে শাঁখ ও নানা ধরনের পাথর প্রভৃতি ।  

সিন্ধুর তুলাজাত দ্রব্য মেসোপটেমিয়ায় রপ্তানি করা হত । তখন মুদ্রা ব্যবস্থা চালু হয়নি , তাই বিনিময়ের মাধ্যমে কেনাবেচা চলত । মেসোপটেমিয়ার সাথে যে সুদুঢ় বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল , তা বোঝা যায় উভয় অঞ্চলে প্রাপ্ত পরস্পরের নিদর্শন থেকে । বস্তুত সিন্ধু – উপত্যকার অধিবাসীরা যে উন্নত ও বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন , সুসংগঠিত বাণিজ্য ছাড়া তা অবশ্যই সম্ভব হত না ।

ধর্ম

সিন্ধু অঞ্চলে আবিষ্কৃত সীলমোহর ও মূর্তি থেকে তাদের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে জানা যায় । সেকালের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল মূর্তিপূজা । পোড়ামাটির অর্ধনগ্ন দণ্ডায়মান নারীমূর্তি পাওয়া গেছে । মূর্তির কটিদেশে আবরণ আছে । অলঙ্কারে সজ্জিতা এই ধরনের মূর্তি পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিতেও পাওয়া গেছে । নারীমূর্তিগুলি মাতৃকাদেবীর বলেই মনে হয় । হরপ্পার একটি সীলে নারীমুর্তি উত্থানপদ ভঙ্গীতে দেখা যায় । একটি চারাগাছ তার গর্ভ থেকে উদগত হয়েছে । এই থেকে মনে হয় সেকালে উদ্ভিদ প্রজনন শক্তির উপাসনা প্রচলিত ছিল । 

হরপ্পায় একটি সীলে নরবলির আভাস পাওয়া যায় । একটি সীলমোহরে তিনটি শৃঙ্গ বিশিষ্ট মুদ্রিত চক্ষু ও ধ্যানমগ্ন এক যোগীপুরুষের মুর্তি পাওয়া গেছে । একে শিবের পূর্ব- সংস্করণ বলে মনে করা হয় । এ ছাড়া গাছ , নদ নদী প্রভৃতি প্রাকৃতিক শক্তি ও বিভিন্ন জীবজন্তুর পুজোও প্রচলিত ছিল ।

সামুদ্রিক ক্রিয়াকলাপ

সিন্ধুবাসীদের সামুদ্রিক তৎপরতার বহু প্রমাণ পাওয়া যায় । ধ্বংসাবশেষ থেকে ঝিনুকের তৈরি হাতা বা চামচ , ঝিনুকের বলয় ও মুক্তাখচিত অলংকার পাওয়া গেছে । ঝিনুক বা মুক্তা গভীর সমুদ্র থেকেই এরা সংগ্রহ করত — এ ধারণা করা যায় । অধ্যাপক ম্যাকির মতে , সমুদ্রপথেই সিন্ধুদেশের সাথে মিশর , সুমেরু , ইলম প্রভৃতি দেশের যোগাযোগ হত । গুজরাটের অন্তর্গত লোথালে আবিষ্কৃত পোতাশ্রয়ের ধ্বংসাবশেষ এই তথ্যকে সমর্থন করে । এটি ছিল দৈর্ঘ্যে ৭১ ফুট ও প্রস্থে ১২০ ফুট । এছাড়া সীলমোহরে নোঙ্গর – করা নৌকার প্রতিচ্ছবিও এদের সামুদ্রিক তৎপরতার সাক্ষ্য বহন করে ।

সামাজিক শ্রেণীবিন্যাস

মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার নগরবিন্যাস থেকে অনুমান করা হয় , সমাজে শ্রেণীবিভাগ ছিল । মোটামুটিভাবে তৎকালীন সমাজকে উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত — এই তিন ভাগে ভাগ করা হয় । ক্ষমতাসীন শাসকসম্প্রদায় প্রথম শ্রেণীভুক্ত ছিল এবং ধনী বণিকসম্প্রদায় বা বুর্জোয়া মধ্যবিত্তরা ছিল দ্বিতীয় শ্রেণীভুক্ত । তৃতীয় শ্রেণীতে ছিল দরিদ্র শ্রমিক ও কৃষককুল । এরা প্রথম দুই শ্রেণী কর্তৃক শোষিত হত ।  

সবার নীচে ছিল অসংখ্য ক্রীতদাস । এরা শস্য ঝাড়াই , ভারী বোঝা বহন , পয়ঃপ্রণালী পরিষ্কার প্রভৃতি কাজ করত । দালান – কোঠা সমন্বিত বাড়ী দেখে মনে হয় , তকালীন সমাজে রক্ষণশীলতা ছিল । হরপ্পার শ্রেণীবিন্যাস দেখে অনুমান করা হয় যে , পরবর্তীকালে বর্ণবৈষম্য ব্যবস্থা এখানে ভ্ৰূণ অবস্থায় ছিল ।

Leave a comment