প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান

প্রাচীন যুগে রচিত বিভিন্ন জীবনীগ্রন্থ , রাজপ্রশস্তি ও বিভিন্ন ফলকে ও স্তম্ভে খোদিত নির্দেশাবলী থেকে প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার বহু উপাদান পাওয়া যায় । প্রাচীন যুগের ভারত ইতিহাসের উপাদানগুলিকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায় , যথা— ( ক ) ধর্মশাস্ত্র ও সাহিত্য , ( খ ) প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান ও ( গ ) বৈদেশিক বিবরণ ।

প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের গুরুত্ব সর্বাধিক । ভারতের অভ্যন্তরে ও বাইরে খননকার্য চালিয়ে বহু প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান আবিষ্কৃত হয়েছে , যা ভারত সভ্যতার বৃহৎ তথ্য আমাদের সামনে উপস্থাপিত করেছে । যেমন , হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোতে খননকার্যের ফলেই আমরা জানতে পেরেছি যে , খ্রীষ্টের জন্মের বহু পূর্বেও ভারতে উন্নত সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল । এজন্যই প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানকে ‘প্রাচীন ভারত ইতিহাসের প্রধান নোঙর ‘ বলে অভিহিত করা হয় । প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানগুলিকে ( ক ) প্রাচীন লিপি , ( খ ) মুদ্রা এবং ( গ ) সৌধ ও স্মৃতিস্তম্ভ — এই তিনভাগে ভাগ করা যায় ।

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় লিপির গুরুত্ব

প্রাচীন লিপির গুরুত্ব প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক ভি.  স্মিথ বলেছেন : ‘প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানসমুহের মধ্যে লিপি বা লেখাগুলিকে প্রথম স্থান দেওয়া হয়;- কারণ তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে এদের অবদান অমুল্য ।’ প্রাচীন ভারতীয় শাসকেরা পর্বতগাত্র , প্রস্তরখণ্ড , তাম্রপট ও স্তম্ভে বা মন্দিরগাত্রে বিভিন্ন লিপি উৎকীর্ণ করাতেন । ঐসব লিপির পাঠোদ্ধার করে প্রাচীন যুগের সামাজিক , রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় বহু তথ্য পাওয়া গেছে । লিপিতে প্রাপ্ত সন , তারিখ থেকে বিভিন্ন রাজবংশের সময়কাল , লিপিগুলির অবস্থান থেকে বিভিন্ন রাজ্যের সীমানা এবং খোদিত বিবরণ থেকে রাজবংশের নাম ও রাজাদের কৃতিত্ব — প্রভৃতি বহু তথ্য জানা সম্ভব হয় । মহেঞ্জোদারোতে প্রাপ্ত লিপিই সর্বাধিক প্রাচীন । তবে এগুলির পাঠোদ্ধার করা এখনো সম্ভব হয়নি ।

মৌর্য সম্রাট অশোকের লিপিই প্রাচীন ভারতের লিপিযুগের সূচনা করেছে । পরবর্তীকালে খোদিত লিপিসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল , কনিষ্কের ‘ মথুরা পেশোয়ার লিপি ‘, সমুদ্রগুপ্তের সভাকবি হরিসেন বিরচিত ‘ এলাহাবাদ লিপি ‘ (প্রশস্তি ) , সাতবাহন রাজাদের ‘ নাসিক ’ও ‘ নানাঘাট লিপি ‘ খারবেলের ‘ হাতিগুম্ফা লিপি ‘ , রুদ্রদামনের ‘ জুনাগড় লিপি ‘ প্রভৃতি ।

কয়েকটি বিদেশী লিপি থেকেও ভারতের ইতিহাসের উপাদান পাওয়া গেছে । এবং নকসিরাস্তো লিপি থেকে পারস্যের সাথে ভারতের যোগাযোগের সূত্র পাওয়া গেছে ।

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় মুদ্রার গুরুত্ব

প্রাচীন ভারত ইতিহাস রচনার একটি অন্যতম উপাদান হল মুদ্রা । বর্তমানের মত প্রাচীনকালে কাগজী মুদ্রা ছিল না , কিংবা অর্থ সঞ্চয়ের জন্য ব্যাঙ্কও ছিল না । তখনকার মুদ্রা ছিল পোড়ামাটির এবং ধাতুর । মানুষ সঞ্চয়ের জন্য মুদ্রা নির্দিষ্ট পাত্রে জমিয়ে রাখত । পরবর্তীকালে খননকার্যের ফলে ঐসব মুদ্রা পাওয়া গেছে । মুদ্রা বিশারদগণ ( Newmismtics ) এসব মুদ্রার লিপি , ছবি বা আকৃতি বিশ্লেষণ করে নানা ঐতিহাসিক তথ্য আবিষ্কার করেছেন । প্রাচীন ভারতের এমন বহু শাসকের অস্তিত্ব ছিল , যাদের সম্পর্কে শুধুমাত্র মুদ্রা থেকেই তথ্য পাওয়া সম্ভব । ইতিহাসের উপাদান হিসেবে মুদ্রার বহুমূখী অবদান স্বীকৃত । যেমন-

( ক ) মুদ্রায় খোদিত সন-তারিখ থেকে নির্দিষ্ট রাজার শাসনকাল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় । তেমনি কোন বংশের শাসকদের বা বিভিন্ন বংশের ক্রমপরম্পরা সম্পর্কে মুদ্রার সন-তারিখ আমাদের আভাস দেয় ।

( খ ) মুদ্রার প্রাপ্তিস্থান থেকে কোন রাজা বা রাজবংশের সাম্রাজ্যসীমা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় । এমনকি মুদ্রার প্রাপ্তিস্থান দুই বা ততোধিক দেশের মধ্যে রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিষয়ে ধারণা পেতে সাহায্য করে । ভারতে প্রাপ্ত বহির্দেশীয় মুদ্রা বা বহির্ভারতে প্রাপ্ত এদেশীয় মুদ্রা থেকে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিষয়ে জ্ঞানলাভ করা যায় ।

( গ ) কোন রাজা বা রাজবংশের অর্থনৈতিক অবস্থার ছবিও মুদ্রা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে । মুদ্রায় ব্যবহৃত ধাতু বা ধাতুর পরিমাণ ঐ যুগের আর্থিক সচ্ছলতা বা দৈন্য সম্পর্কে আভাস দেয় । গুপ্তযুগে প্রচলিত স্বর্ণমুদ্রার তুলনায় পরবর্তী গুপ্তযুগের স্বর্ণমুদ্রায় খাদ্যের পরিমাণ বেশি ছিল । এই থেকে ধরে নেওয়া যায় যে , পরবর্তীকালে স্বর্ণ মুদ্রার প্রচলন কমে যাওয়ায় বোঝা যায় যে , তখন ব্যবসাবাণিজ্যে মন্দা এসেছিল ।

( ঘ ) মুদ্রায় খোদিত ছবি থেকে কোন রাজা বা রাজবংশের সাংস্কৃতিক চিন্তাভাবনার ধারণা পাওয়া যায় । সমুদ্রগুপ্তের বীণাবাদনরত মূর্তি থেকে মনে করা যেতে পারে যে , তিনি সঙ্গীতানুরাগী ছিলেন । একইভাবে মুদ্রার ছবির আকৃতি বহির্দেশের প্রভাব সম্পর্কেও আমাদের জ্ঞানবৃদ্ধিতে সাহায্য করে । মুদ্রায় খোদিত দেব- দেবীর মূর্তি সমসাময়িক ধর্মভাবনা ও দেব দেবীর অস্তিত্ব সম্পর্কে চিত্র তুলে ধরে ।

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় সৌধ , স্মৃতিসৌধ এর গুরুত্ব

সৌধ , স্মৃতিস্তম্ভ ও সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ থেকেও প্রাচীন সভ্যতার বিকাশ সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করা যায় । বিশেষ স্থাপত্য ও ভাস্কর্য কর্মের নিদর্শন হিসেবে এদের অবদান অনস্বীকার্য । মহেঞ্জোদারোর ধ্বংসাবশেষ থেকে ঐ যুগের উন্নত সংস্কৃতি ও ধর্মবিশ্বাসের তথা সমাজজীবনের সুদীর্ঘ বিবরণ রচনা করা সম্ভব হয়েছে । এ ছাড়া পাটলিপুত্র , সারনাথ , তক্ষশিলা প্রভৃতি নগরীর ধ্বংসাবশেষ থেকে সমসাময়িক জনসাধারণের ধর্ম ভাবনা , জীবনযাত্রা ও শিল্পকর্ম সম্বন্ধে জানা সম্ভব হয়েছে । বিভিন্ন মঠ ও মন্দিরের নির্মাণশৈলী বা মন্দিরগাত্রে খোদিত চিত্রাবলী থেকেও প্রাচীনকালের ধর্ম ভাবনা বা স্থাপত্যকর্মের ইতিহাস জানা যায় । অঙ্কোরভাট ও বরবোদরের মন্দিরগুলি থেকে যথাক্রমে কম্বোজ ও জাভার সাথে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

Leave a comment