প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের সাহিত্যিক উপাদান

প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের সাহিত্যিক উপাদান

প্রাচীন যুগে রচিত বিভিন্ন জীবনীগ্রন্থ , রাজপ্রশস্তি ও বিভিন্ন ফলকে ও স্তম্ভে খোদিত নির্দেশাবলী থেকে প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার বহু উপাদান পাওয়া যায় । প্রাচীন যুগের ভারত ইতিহাসের উপাদানগুলিকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায় , যথা— ( ক ) ধর্মশাস্ত্র ও সাহিত্য , ( খ ) প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান ও ( গ ) বৈদেশিক বিবরণ ।

ধর্মশাস্ত্র ও সাহিত্যিক উপাদান

বৈদিক সাহিত্য :

প্রাচীন ভারত ইতিহাসের প্রাথমিক উপাদান হিসেবে বৈদিক সাহিত্য গুরুত্বপূর্ণ । চতুর্বেদ , সূত্র-সাহিত্য , বেদাঙ্গ প্রভৃতি গ্রন্থ থেকে আর্যদের বসতি বিস্তার , সমাজ জীবন , কৃষি- বাণিজ্য , ধর্মবিশ্বাস ইত্যাদি বিষয়ে নানা তথ্য পাওয়া যায় ।

বৌদ্ধ ও জৈন গ্রন্থ :

খ্রীষ্টপূর্ব যুগের ভারত ইতিহাস রচনার একটি প্রধান উপাদান হল বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মসাহিত্য গুলি । বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থগুলি থেকে তৎকালীন ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন সম্পর্কে বহু তথ্য পাওয়া যায় । ‘ জাতক ‘ – এর কাহিনীগুলি থেকে বুদ্ধের জীবন ও সমসাময়িক সামাজিক অবস্থার কথা জানা যায় । এই পর্যন্ত প্রায় ৫৪ টি জাতকের কাহিনী সংগৃহীত হয়েছে । সিংহলীয় বৌদ্ধ সাহিত্য ‘ দীপবংশ ’ ও ‘ মহাবংশ ‘ থেকে বুদ্ধের জীবনী ও চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের বংশপরিচয় সম্বন্ধে বহু তথ্য পাওয়া যায় । ‘ ললিত-বিস্তার ’ ও ‘ বৈপুল্য-সূত্র ‘ থেকেও বুদ্ধের জীবনী সম্পর্কে জানা যায় । জৈন গ্রন্থগুলির মধ্যে ‘ ভগবতী-সূত্র ‘ ও ‘ আচারঙ্গ-সূত্র ‘ থেকেও বহু ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায় ।

পুরাণ সাহিত্য :

প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসাবে ‘ পুরাণ ’ সমূহের অবদান অনন্য । এজন্য একে ইতিহাস-পুরাণ বলা হয় । অষ্টাদশ পুরাণের মধ্যে পাঁচটির ঐতিহাসিক মূল্য অনস্বীকার্য । অবশ্য ইতিহাসের উপাদান হিসেবে পুরাণের গুরুত্ব সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে । ভিনসেন্ট স্মিথএফ. পার্টিজার প্রমুখের মতে , পুরাণে কিংবদন্তী ও ঐতিহাসিক তথ্য এমনভাবে মিশে আছে যে , খুব সতর্কতার সাথে গ্রহণ করলে ভুল তথ্য এসে যেতে পারে । তা ছাড়া , পুরাণে বর্ণিত সময়কাল খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী বা তারও পূর্বের । অথচ পুরাণ সংকলিত হয়েছে সম্ভবত গুপ্তযুগে । তাই এতে কল্পনার প্রাবল্য থাকা স্বাভাবিক ।  

মহাকাব্য :

ভারতের দুই জনপ্রিয় মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারত থেকেও বহু ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায় । এগুলি থেকে প্রাচীন রাজবংশগুলির কীর্তিকলাপ , সভ্যতার বিস্তার ইত্যাদি সম্পর্কে বহু তথ্য পাওয়া যায় । অবশ্য রামায়ণের ঐতিহাসিকতা নিয়ে সন্দেহ আছে । তবে মহাভারতের ঐতিহাসিক মূল্য স্বীকৃত । কুরুক্ষেত্র যুদ্ধকে ঐতিহাসিক ঘটনা বলেই মনে করা হয় ।

জীবনচরিত :

প্রাচীন যুগে রচিত জীবনচরিতগুলিও ঐতিহাসিক উপাদান হিসেবে মূল্যবান । এগুলির মধ্যে বাণভট্টের ‘ হর্ষচরিত ’ , কলহন- এর ‘ বিক্রমাঙ্কদেব-চরিত ‘ , বিশাখাদত্তের ‘ মুদ্রারাক্ষস ’ , সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘ রামচরিত ‘ , বাক্‌পতির ‘ গৌড়বহে , পদ্মগুপ্তের ‘ নবশাহশাঙ্ক-চরিত ‘ ন্যায়চন্দ্রের ‘ হামির কাব্য ‘ বল্লাল রচিত ‘ভোজ-প্রবন্ধ ‘ প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযোগ্য । এইসব রচনার মুখ্য উদ্দেশ্য রাজাদের গুণকীর্তন হলেও , সমসাময়িক বহু ঐতিহাসিক ঘটনা এগুলি থেকে আহরণ করা যায় ।

 রাজতরঙ্গিনী :

প্রাচীন যুগে কোন কোন রাজা ধারাবাহিক ইতিহাস রচনারও পৃষ্ঠপোষকতা করতেন । এই প্রসঙ্গে কলহন বিরচিত ‘ রাজতরঙ্গিনী ‘ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । এই গ্রন্থ রচনায় কলহ সমসাময়িক বহু গ্রন্থের সাহায্য গ্রহণ করেছিলেন । এই গ্রন্থ থেকে কাশ্মীরের ঘটনার ধারাবাহিক বিবরণ পাওয়া যায় ।

সংস্কৃত সাহিত্য :

সমসাময়িক কালে রচিত বিভিন্ন সংস্কৃত সাহিত্য ও নাটিকাবলী থেকেও প্রাচীন যুগের বহু তথ্য পাওয়া যায় । এই প্রসঙ্গে কৌটিল্যের ‘ অর্থশাস্ত্র ‘ একটি বিখ্যাত গ্রন্থ । এতে রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে বহু তথ্য আছে । বাৎস্যায়নের ‘ কামসূত্র ‘ , পতঞ্জলির ‘ মহাভাষ্য ‘, ‘ গার্গী সংহিতা ‘ প্রভৃতি গ্রন্থও ইতিহাসের উপাদান হিসেবে সাহায্য করে।

Leave a comment